ঈদ, স্মৃতি ও শোক


 ঈদ, স্মৃতি ও শোক

এবারে গ্রামে ঈদের আনন্দ ভাগ করতে এসে বিয়োগ করতে হলো তার দ্বিগুণ। আরিফ, আমার ভাইটারে হারালাম। যেটা কল্পনা ও জ্ঞানের বাইরে। অল্প সময়ে ভাইটার হায়াত ফুরিয়ে এলো। এসব আল্লাহর পরিকল্পনা। পৃথিবীতে এরচেয়ে আর কোন সুন্দর পরিকল্পনা নেই। রবের এই পরিকল্পনা বোঝার সাধ্য আমাদের নাই। আমরা মানুষ। আমাদের মন অবুঝ। আকষ্মিক মৃত্যু আমাদের কাঁদায় বেশি। মৃত্যুতে দোয়া ছাড়া আর বিকল্প কোন পথ থাকে না। জন্ম এবং মৃত্যু সবই আল্লাহর হাতে। তিনিই সকল সৃষ্টির মালিক।


তবুও আমরা শোকে পাথর হই। কোন মৃত্যুই আমরা সইতে পারি না। স্মৃতি ও শোক ভোলা যায় না। বাবার সাথে আরিফের মৃত্যুতে বিয়োগ বেদনা যোগ হলো আরো। বাবা ছাড়া এটা আমার তৃতীয় ঈদ। আগে যেমনটা পরিবারে ঈদের আমেজ থাকতো বাবার ইন্তেকালের পর থেকে আর আনন্দ বা আমেজ তেমনটা নেই। পুরো পরিবারে কেমন শূন্যতা বিরাজ করে আছে। কালো পর্দার ছায়া পড়েছে ঘরের চতুর্দিকে। এই শূন্যতা ও ছায়া বাবা হারানোর।

ঈদ এলে মায়ের মুখ মলিন হয়ে থাকে। মুখে হাসি নেই। ঈদের জামাত শেষ করে এসে দেখি মা রান্না ঘরে বসে কান্না করছে। মা কেন কান্না করছে এইটা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার নেই। নেই শক্তিও। আমি কোন কথা ছাড়াই মায়ের কোলে মাথা রাখি। মায়ের আঁচলে কান্নার চোখ আড়ালে ঢাকি। এই কান্না বলে দেয় বাবা হারানোর হাহাকার মা থেকে শুরু করে পুরো পরিবারে।

প্রতি ঈদে এমনিতেই পরিবারে শোক। তার উপর এবারে ঈদের পঞ্চম দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো আরিফ, আমার ভাই। ঈদের পর পর দু'দিন একসাথে খাওয়া দাওয়া ও গল্প হলো। নানান প্রসঙ্গে কথাও হলো। শুধু ভাইটা বলে গেলো না তার চলে যাওয়ার সময় ফুরিয়ে এসেছে।

যেদিন আরিফ এক্সিডেন্ট করলো ঠিক তার ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই খবর এলো আরিফ এক্সিডেন্ট করেছে, আমি এই খবর শুনে পুরোই তাজ্জব বনে গেলাম। আঙ্কেলের কাছে কল দিতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ফেনী জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে তাওসিফের সাথে দেখা হলো। তাওসিফের চোখে অনবরত পানি ঝরছে। আমি মর্গে ছুটে গিয়ে দেখি আমার ভাই ঘুমিয়ে আছে। মুখে বেহেশতের হাসি।

সকাল থেকে হাসপাতাল ও পুলিশ কতৃপক্ষের ধকল সামলিয়ে পোস্টমর্টেম ছাড়াই রাত সাড়ে আটটার দিকে স্বজন ও সবাই আরিফের ঘরে ফিরে আসি। পুরো বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। কান্নায় ভারী হয়ে আসছে আকাশ-বাতাস। মানুষের ভীড়ে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই উঠোনের কোথাও। একে একে আত্নীয় স্বজন সবাই এলো।

রাত সাড়ে দশটায় জানাযা শেষে আরিফকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে আসলাম। আমার বুক ভাঙা কান্না থামছে না। ভাইটারে হারিয়ে একা হয়ে আছি। অনেকটা অসহায়ের মতো লাগছে। আমার বাবার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি শোকাহত হয়েছি আরিফের মৃত্যুতে। ও আল্লাহ তোমার কাছে এই ফরিয়াদ, আমার ভাইটারে শহীদি দরজা দিও। জীবনের সব ভুল ক্ষমা করে বাবা ও আরিফকে জান্নাতের শীতল পরশে রেখো।